‘বাইবেল সার’-এর সমস্ত বিষয় পবিত্র বাইবেলেরই অংশ। যারা বাইবেল পড়েননি বা যীশু খ্রীষ্টের ওপর বিশ্বাসের মূল বিষয়গুলো জানতে চান তাদের কথা মনে রেখেই বাইবেলের প্রধান বিষয়গুলোর সারমর্ম খুব সহজ সরল বাংলা ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। যীশু খ্রীষ্ট আর ঈশ্বরের আসন্ন নতুন রাজ্যের গভীর সত্যই হল পবিত্র বাইবেলের মূল বিষয়। এসব বিষয় বুঝতে হলে আর উপলব্ধি করতে হলে আপনাকে অবশ্যই শিশুর মতো সরল মন নিয়ে পড়তে হবে। গুপ্তধন খোঁজার মতো করে ঈশ্বরের বাণী যে পড়ে তার জীবনে অবশ্যই সফল হবে ঈশ্বরের এই বাক্য—‘অন্য কারও কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের তোমার কোনও প্রয়োজন নেই।’ আমাদের একান্ত অনুরোধ, এই ‘বাইবেল সার’ বইটা একবার পড়েই ফেলে রাখবেন না। এটা বারবার পড়ুন। এর ফলে প্রথমবারে যে বাণীগুলো আপনি বুঝতে পারেননি পরবর্তী পাঠের সময় আশা করি তা বুঝতে পারবেন। তারপর অন্তত একটা ‘নতুন নিয়ম’ সংগ্রহ করে পড়ুন। “পবিত্র বাইবেলের প্রত্যেকটা কথা ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছে, যা শিক্ষা চেতনা-দান, সংশোধন ও সৎ পথে চলার জন্য প্রয়োজন।”
পবিত্র বাইবেলের দু’টো ভাগ—‘পুরাতন নিয়ম’ ও ‘নতুন নিয়ম’। নিয়ম শব্দের অর্থ হল ঘোষণা, চুক্তি, প্রতিজ্ঞা বা দলিল। এই হল, সেই যুক্তি যা মানব জাতিকে উদ্ধারের জন্য স্বর্গের ঈশ্বর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। ঈশ্বরের এই চুক্তি বলতে বোঝায় যীশু খ্রীষ্টের ক্রুশের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মুক্তি লাভ। আর সেই মুক্তি দ্দ্বারা স্বর্গরাজ্যের উত্তরাধিকারী হওয়া। খ্রীষ্ট বিশ্বাসীরা বিশ্বাস করেন যে, প্রায় ২০০০ বছর আগে ঈশ্বরের পুত্র যীশু খ্রীষ্ট জন্মেছিলেন। তিনি পাপী মানুষের পাওনা শাস্তি নিজের ওপর তুলে নিয়ে ক্রুশে প্রাণ দিয়েছিলেন আর মানব জাতির পাপ চিরদিনের জন্য মুছে দিয়েছেন। অর্থাৎ আমাদের পাপ ক্ষমা হয়ে গেছে আর আমরা ঈশ্বরের কাছ থেকে অনন্ত জীবন পেয়েছি—ঈশ্বরের নিয়মের এই সুসমাচারে আমরা বিশ্বাস করেছি। ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞাত এই সুসমাচার হলো সম্পূর্ণ পবিত্র বাইবেলের মূল বিষয়। যীশু খ্রীষ্টের জন্মের আগে যে চুক্তি লেখা হয়েছিল সেটা হল ‘পুরাতন নিয়ম’ আর যীশু খ্রীষ্টের স্বর্গে চলে যাবার পরে যে চুক্তি লেখা হয়েছিল তা ‘নতুন নিয়ম’। যিহূদী জাতিকে কেন্দ্র করে খ্রীস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ৪০০ বছরের মধ্যে ‘পুরাতন নিয়ম’ লেখা হয়েছিল। বিভিন্ন ভবিষ্যদ্বক্তা এটি লিখেছিলেন। পুরাতন নিয়মে ৩৯ টি বই আছে। যিহূদী জাতির ইতিহাস, আইন, ভবিষ্যদ্বাণী, কবিতা ও গান নিয়ে এগুলি লেখা হয়েছে। এর মধ্যে যীশু খ্রীষ্ট ও ঈশ্বরের আসন্ন নতুন রাজ্য সম্পর্কে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। ঈশ্বরের অভিষিক্ত মশীহ অর্থাৎ খ্রীষ্ট সম্পর্কে পুরাতন নিয়মের সেই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো কীভাবে যীশু খ্রীষ্টের মধ্যে পূর্ণতা লাভ করেছে তার ব্যাখ্যা এবং যীশু খ্রীষ্টের শিক্ষার বর্ণনা করা হয়েছে, ‘নতুন নিয়ম’-এ। সেগুলো ৩০ থেকে ৯০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে যীশুর শিষ্যরা লিখেছিলেন। যীশুর জীবনী বিষয়ে লেখা ৪টি সুসমাচার ২১ টি চিঠি ও আরও ২ টি বই নিয়ে মোট ২৭ টি বই আছে নতুন নিয়মে। যিহূদিরা কেবল পুরাতন নিয়মকেই নিজেদের ধর্মশাস্ত্র বলে মেনে আসছে। কিন্তু খ্রীষ্ট বিশ্বাসীরা ‘পুরাতন নিয়ম’ ও ‘নতুন নিয়ম’ দুটোকেই ঈশ্বরের বাণী ‘পবিত্র বাইবেল’ বলে মানে। প্রথমেই এটা ভালো করে জেনে রাখো যে, ‘বাইবেলের কোনও ভবিষ্যদ্বাণী মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার বিষয় নয়, কিন্তু ভবিষ্যদ্বক্তারা পবিত্র আত্মার পরিচালনায় ঈশ্বরের দেওয়া বাণীই বলেছেন।’
পবিত্র বাইবেল আমাদের বলে, কেমন করে এই বিশ্বে জীবন শুরু হয়েছিল আর কেমন করে ও কেন মানুষের সৃষ্টি হয়েছিল। পবিত্র বাইবেল আমাদের আরও বলে, কেমন করে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে আর তাঁকে অবহেলা করেছে। ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপের জন্যই ঈশ্বর মানুষকে মৃত্যুর ভয়ংকর অভিশাপ দিয়েছেন। পবিত্র বাইবেল বলে যে, জন্ম থেকেই আমাদের ওপর মৃত্যুর শাস্তি ঝুলছে আর তা নিয়েই আমরা বেঁচে আছি। আমাদের কোনও আশা নেই। সত্যিকারের কোনও স্থায়ী আনন্দ ও শান্তি নেই। শুধু মৃত্যুই আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। আমরা ধনী বা গরীব, সবল বা দুর্বল, স্বাধীন বা পরাধীন, অসুস্থ বা সুস্থ যা-ই হই না কেন, কটা দিন পরে আমাদের মরতেই হবে। তারপর? পবিত্র বাইবেল জানায় যে, মৃত্যুর পর বিচারের দিনে সৃষ্টিকর্তার সামনে আমাদের অবশ্যই দাঁড়াতে হবে। তখন বলতেই হবে কেন আমরা তাঁকে আর তাঁর ধার্মিকতার নিয়মকে অবহেলা করেছি। মানুষ নয় ঈশ্বরই আমাদের বিচার করবেন আর তিনি বিচার করবেন তাঁর নিয়ম অনুযায়ী। আমাদের নিয়ম অনুযায়ী নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনও ধর্ম বা দর্শন বা মানুষ নেই যা আমাদের দেখাতে পারে কেমন করে এই ভয়ংকর অভিশাপ থেকে বাঁচতে পারা যায়। একমাত্র পবিত্র বাইবেলই তা দেখায়।
মানুষের পাপ আর হিংস্রতা এতো অসহ্য হয়ে উঠল যে ঈশ্বর তা আর সহ্য করতে পারলেন না। তখন ঠিক করলেন নিঃশ্বাস নেয় এমন সব প্রাণীকে তিনি ধ্বংস করবেন। তাই ঈশ্বরের ভয়ঙ্কর বিচারে জীবিত সকলে মরেছিল। সেইজন্যেই সারা পৃথিবীতে—সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের এবং গভীর গিরিখাতের নীচে চাপা পড়া জীবাশ্ম ও প্রাণীদের অবশেষ আজ আমরা দেখতে পাই। ঈশ্বর ঠিক করেছেন যে, আগামী দিনের বিচারটা হবে আগুন দিয়ে ধ্বংস করে। পবিত্র বাইবেলে 2 পিতর 3:10 লেখা আছে—‘ঈশ্বরের বিচারের দিন চোরের মতো আসবে। ভয়ঙ্কর শব্দে আকাশ ধ্বংস হয়ে যাবে। আগুনে আর তাপে সব জিনিস গলে যাবে। পৃথিবী আর পৃথিবীর সব জিনিস জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাবে।’
মহাজলপ্লাবনের পর নোহ অনেক বছর বেঁচেছিলেন। ধীরে ধীরে পৃথিবী আবার লোকজনে ভরে গেল। কিন্তু লোকজন যত বাড়তে লাগল, ঈশ্বরের বিরুদ্ধে তারা ততই বিদ্রোহ আর পাপ করতে লাগল। তারা ঈশ্বরের বদলে মূর্তি তৈরী করে পুজো করতে লাগল, নানা ধর্মের প্রবর্তন শুরু করল। কয়েক শ’বছর পর জগৎ আবার পাপে ভরে গিয়ে অন্ধকারে ডুবে গেল। এরপর ঈশ্বর ভবিষ্যদ্বক্তাদের মধ্যে দিয়ে বার বার এই সতর্ক বাণী পাঠাতে লাগলেন যে, পাপে ভরা পৃথিবীকে তিনি ধ্বংস করবেন। অনুতাপ করার জন্য মানুষের কাছে ঈশ্বরের বার্তা বয়ে এনেছিলেন এই ভবিষ্যদ্বাক্তারা। অথচ তাদেরই অপমান আর অত্যাচার করা হল। এমনকি অনেক ভবিষ্যদ্বাক্তাকে খুনও করা হয়েছিল। কিন্তু ঈশ্বর মানুষকে ভালোবাসেন, তাই তিনি যুগে যুগে এই ভবিষ্যদ্বাক্তাদের জগতে পাঠাতে থাকলেন।
ঈশ্বর ভবিষ্যদ্বক্তাদের মুখ দিয়ে আমাদের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, একদিন তিনি মন্দ থেকে বিশ্বাসীদের পবিত্র করবেন আর পাপ থেকে তাদের পরিত্রাণে নিয়ে যাবেন। তিনি আরও প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, এমন এক দিন আসছে যেদিন তিনি ধার্মিকতার রাজ্য স্থাপন করবেন। তিনি নিজেই সেই রাজ্য শাসন করবেন। ভবিষ্যদ্বক্তারা আরও বলেছিলেন যে, ঈশ্বর জগতে এক মানুষকে পাঠাবেন। প্রথমে তিনি আসবেন পাপীদের ‘পরিত্রাতা’ হয়ে। পরে ‘রাজা’ ও ‘বিচারক’ হিসাবে তিনি আবার পৃথিবীতে আসবেন। এই মুক্তিদাতা, রাজা ও বিচারককে ভবিষ্যদ্বক্তারা নাম দিয়েছেন ‘মশীহ’। যীশু খ্রীষ্টের জন্মের অনেক দিন আগে থেকেই তাঁর বিষয়ে ভবিষ্যদ্বক্তারা এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
পবিত্র বাইবেলের সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, সারা বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা মানুষ রূপে এসেছিলেন। একেবারে আমাদের মতোই একজন মানুষ। কারণ তিনি আমাদের ভালোবেসেছিলেন। আমাদের পাপের ভয়াবহ ফল থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজেই মহিমাময় রাজা, সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা, পবিত্র ঈশ্বর। মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে আর আমাদের পাপের জন্য শাস্তি নিতে তিনি এই ঘৃণ্য পাপ জগতে এসেছিলেন। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সব মানুষের জন্য জগতের পাপ তুলে নিতেই তিনি এসেছিলেন। লোকেরা তাঁর হাতদুটো পেরেক দিয়ে বিদ্ধ করেছিল। তাঁর মুখে থুতু দিয়েছিল আর রক্তাক্ত করেছিল। মানুষের পাপের জন্য তিনি নিজেরই ওপর শাস্তি তুলে নিয়েছিলেন।
অধ্যায় ৬ অপূর্ব শিক্ষা ও অলৌকিক কাজ
আজও যীশু খ্রীষ্টের বাণী মানুষের হৃদয়ে আঘাত করে। কারণ তাঁর বাণীতে আছে ধার্মিকতা, নম্রতা ও পবিত্রতা। যীশু খ্রীষ্ট কিন্তু শুধু সুন্দর সুন্দর কথাই বলেননি। তিনি তাঁর শিষ্যদের বলেননি, “আমার শিক্ষা মেনে চলো।” তিনি বলেছেন, “আমার পিছনে পিছনে চলো।” এই ভাবে খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদেরও উচিত তাদের জীবনে ধার্মিকতা, প্রেম ও পবিত্রতার এক আদর্শ তুলে ধরা। টাকা-পয়সা আর জগতের জিনিসপত্রের ওপর লোভ করা এবং মানুষের কাছ থেকে সস্মান আর প্রশংসা পাওয়ার আশা করা উচিত নয়। ‘অন্য লোকের জীবনকে ক্ষমতা আর শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করব’—এমন চিন্তা-ভাবনা করাও ঠিক নয়। আসলে যীশু খ্রীষ্টই তো আমাদের সকলের আদর্শ।
যীশু খ্রীষ্ট শিষ্যদের বলেছেন, “জগৎ আমাকে ঘৃণা করে। কারণ জগৎ যা করে আমি সেটাকেই মন্দ বলে থাকি। জগৎ যদি তোমাদের ঘৃণা করে তবে মনে রেখো, আগে সে আমাকে ঘৃণা করেছে। যদি তারা আমাকে অত্যাচার করে, তা হলে তারা তোমাদেরও অত্যাচার করবে। আমার জন্যই তারা তোমাদের ওপর এ রকম করবে। আসলে আমাকে যিনি পাঠিয়েছেন, তাঁকে এরা চেনে না।” সুতরাং এ কথা একদম সত্যি যে, যীশু খ্রীষ্টের স্বর্গে যাওয়ার পর থেকে বহু শতাব্দী ধরে খ্রীষ্ট বিশ্বাসীরা বিভিন্ন জায়গায় অত্যাচারিত হয়েছে। এটাই হল প্রকৃত খ্রীষ্ট বিশ্বাসীর পরিচয়। পবিত্র বাইবেল খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের সহ্য করতে আর স্বর্গ রাজ্যের জন্য অপেক্ষা করতে বলে। এ ক্ষেত্রে যীশু খ্রীষ্টই আমাদের আদর্শ।
অধ্যায় ৮ মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত
রাজাদের রাজা আর প্রভুদের প্রভু মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন। অথচ সেই মানুষেরই পাপের বোঝা নিজের ওপর তুলে নিয়েছিলেন। কাঁটার মুকুট তাঁর মাথায় চেপে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে রক্ত ঝরে পড়েছিল আর লোকেরা তাঁর মুখে থুতু দিয়েছিল। তাঁর হাতে ও পায়ে পেরেক বিদ্ধ করা হয়েছিল আর তিনি ছিলেন উলঙ্গ। ভীষণ যন্ত্রণায় গোঁগাছিলেন আর তাঁর শরীর মোচড়াচ্ছিল। তিনি মরেছিলেন যেন আমরা জীবন পাই। তিনি কষ্ট ভোগ করেছিলেন যাতে আমরা ক্ষমা পাই। তাঁর ক্ষত স্থানের জন্যই আমরা সুস্থ হয়েছি। সেইজন্যই খ্রীষ্ট বিশ্বাসীরা তাদের রাজাকে ভালোবাসে। এজগতে পাপের এই ভয়াবহ সমস্যা মেটানোর আর অন্য কোনও উপায় নেই। পবিত্র বাইবেল আমাদের বলে, স্বর্গে ঢোকার দরজা সরু। খুব অল্প ক’জনই সেটা খুঁজে পায়।
খ্রীষ্টীয় সুখবরের শক্তি, মহিমা ও আশা হল যীশু খ্রীষ্টের মৃত্যু থেকে আবার জীবিত হওয়ার ঘটনাটা। যদিও অনেক লোক খ্রীষ্টের পুনরুত্থানকে অবহেলা করে। তবুও খুব বোকা না হলে কেউই এই মহা সত্যকে অস্বীকার করতে পারে না। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা জগতকে ওলট পালট করে দিয়েছে। এই সুখবরই খ্রীষ্ট বিশ্বাসীরা জগতে প্রচার করে থাকে আর জগতের কাছে বলা উচিত। যীশু খ্রীষ্ট মৃত্যু থেকে বেঁচে উঠেছেন বলে আমরাও মৃত্যু থেকে বেঁচে উঠব আর স্বর্গের মহিমাময়, অনন্ত রাজ্যে প্রবেশ করব। সারা মানব জাতির ওপরে মৃত্যুর যে অভিশাপ ঝুলে আছে তা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় এই সুখবর। এছাড়া সারা বিশ্বে মৃত্যুর ওপর আর কোনও আশা নেই, জয় নেই।
যীশু খ্রীষ্ট স্বর্গে চলে যাওয়ার পর খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের ওপর ভীষণ অত্যাচার শুরু হল। যীশুকে ‘মশীহ’ বলার জন্য আর ঈশ্বরের সুখবর প্রচার করার জন্য যীশুর শিষ্য যোহনকে ভূমধ্যসাগরের পাটমস্ দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে এই পৃথিবীতে কী কী ঘটবে সেসব এক দর্শনের মধ্যে দিয়ে ঈশ্বর যোহনের কাছে প্রকাশ করলেন। এই কথাগুলোই যুগ যুগ ধরে আনন্দ আর উৎসাহের এক উৎস হয়ে উঠেছে। যারা যীশু খ্রীষ্টের ওপর বিশ্বাস করার জন্য দুঃখ-দুর্দশায় পড়ে আর অত্যাচার ভোগ করে তারা এই কথায় প্রেরণা পায়। ঈশ্বর আমাদের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, অবশ্যই এক নতুন পৃথিবী হবে যেখানে কোনও দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণা থাকবে না আর যারা ঈশ্বরকে মেনে চলে ঈশ্বর তাদের পুরস্কার দেবেন। এসব পবিত্র বাইবেলের ‘যোহনের প্রকাশিত বাক্যে’ লেখা আছে।
অধ্যায় ১১ পৃথিবীর শেষ ও নতুন আশা
খ্রীষ্টীয় প্রথম শতাব্দীর শেষ দিকে যীশু খ্রীষ্টের শিষ্যরা আর যারা তাঁকে বিশ্বাস করত তারা সারা পৃথিবীতে তাঁর বাণী বয়ে নিয়ে গেল। এই বাণীকে তারা বলত ‘সুখবর’ বা ‘সুসমাচার’। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় অনেক নতুন খ্রীষ্ট বিশ্বাসী ছিল। তাদের উৎসাহ দিতে আর তাদের বিশ্বাসকে দৃঢ় করতে যীশু খ্রীষ্টের শিষ্যরা অনেক চিঠি লিখেছিলেন। শিষ্যদের লেখা ২১ টি চিঠির মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের বাক্য আমাদের দেওয়া হয়েছে। এই বাইবেল সারের ১১ অধ্যায় থেকে ১৪ অধ্যায়ের মধ্যে সেই চিঠিগুলো থেকে কিছু অংশ তুলে ধরা হল।
অধ্যায় ১২ খ্রীষ্টের দ্বারা মুক্তি
ধর্ম বা ধর্মের শিক্ষকেরা মানুষকে কিছু নিয়ম শেখায় যাতে ইহকালে আর পরকালে সুখী হওয়ার জন্য সেগুলো তারা পালন করে। ওসব নিয়ম মেনে চলার জন্য ধর্ম-শিক্ষকদের বশে থাকতে তারা লোকেদের উৎসাহ দেয়। কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত মানুষই ঈশ্বরের বিষয় জানে। তবুও তারা ঈশ্বরকে মেনে চলে না বা মেনে চলতেও চায় না। তারা নিজেদের ইচ্ছা মতো জীবন যাপন করে। ঈশ্বরের বিরোধিতা করতে ভালোবাসে। চিন্তায় ও কাজে সব সময় পাপ করে চলে। কারণ মানুষ পাপের দাস হয়ে গেছে। আর তাই পাপ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেও মানুষ তা পারে না। এই অসহায় পাপী মানুষকে নরকের শাস্তি থেকে কে বাঁচাবে? মানুষের অতিরিক্ত লাম্পট্য আর পাপের জন্য ঈশ্বর নিজেই যীশু খ্রীষ্টকে পাঠিয়েছিলেন যাতে যীশু মানুষের হয়ে তাদের বদলে মানুষের পাপ নিয়ে যান। যীশু খ্রীষ্ট ক্রুশের ওপর এ কাজ করেছিলেন। মানুষের পাপ নিজের শরীরে বয়ে তিনি ঈশ্বরের ঘৃণা ও ক্রোধের শিকার হয়েছিলেন। মানুষের পাপের জন্য তাঁকে মানুষের অবজ্ঞা ও বিদ্রুপ সহ্য করতে হয়েছিল। এখন আর পাপের কোনও সমস্যা নেই। ঈশ্বর পাপী মানুষকে ধার্মিক বলে গণ্য করেন। ঈশ্বর চান আমরা যেন এসব সরল ভাবে বিশ্বাস করি আর এ নিয়ে খুশী থাকি। ঈশ্বর কথা দিয়েছেন, যারা যীশু খ্রীষ্টে বিশ্বাস করে এবং যীশু খ্রীষ্টের মৃত্যুর কারণে মানুষের পাপের ক্ষমা হয়েছে বলে স্বীকার করে, ঈশ্বর তাদের পবিত্র আত্মা দেবেন। তারা নতুন মানুষ হয়ে উঠবে। তাদের হৃদয় নতুন হয়ে উঠবে। এটাই হল সুসমাচার অর্থাৎ সুখবর। এই অধ্যায়ের বিষয়বস্তুই এটা যা যীশু খ্রীষ্টের শিষ্য পৌলের লেখা চিঠি থেকে নেওয়া হয়েছে।
অধ্যায় ১৩ প্রভু যীশুর ভক্তদের প্রতি
পবিত্র বাইবেলে আমরা দেখতে পাই যে, খ্রীষ্ট বিশ্বাসী হওয়ার মানে কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া নয় বা কোনও নেতাকে বা কোনও বাকপটু শিক্ষককে মেনে চলা নয়। বরং এরকম বিষয়কে এড়িয়ে যেতে যীশু খ্রীষ্ট আমাদের সতর্ক করেছেন। খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের জন্য শিষ্যদের লেখা চিঠিগুলো যখন পড়ি তখন দেখতে পাই যে, শিষ্যরা শিক্ষা দিয়েছেন যাতে ঈশ্বরের বাক্যের কাছে বাধ্য থেকে পবিত্র জীবন যাপন করি। আরও বলেছেন যাতে এই জগতের লোভ লালসা থেকে সরে থাকি, দুঃখ-কষ্ট আর এমনকি অত্যাচারও সহ্য করি। ঈশ্বরের যে রাজ্য তাড়াতাড়ি আসছে সেখানে অনন্ত জীবন যাপনের আশায় আনন্দের সঙ্গে জীবন কাটাতে উৎসাহ দিয়েছেন। খ্রীষ্ট বিশ্বাসী ভাই-বোনদের ভালোবাসার আর তাদের সাহায্য করার ওপর আমাদের গুরুত্ব দিতে বলেছেন।
একজন আসল খ্রীষ্ট বিশ্বাসীর লক্ষণ হল শিক্ষা নয়, সুন্দর করে কথা বলা নয়, ক্ষমতা নয় বা উন্নতি নয়। কিম্বা অন্য খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের মধ্যে উঁচু পদ বা সম্মান পাওয়া নয়। একজন আসল খ্রীষ্ট বিশ্বাসীর লক্ষণ হল, সে তার বিশ্বাসী ভাই-বোনকে অন্তর দিয়ে ভালবাসবে। পবিত্র বাইবেলে 1 যোহন 3:23 তে লেখা আছে,—‘ঈশ্বরের আদেশ হল, আমরা যেন তাঁর পুত্র যীশু খ্রীষ্টের নামে বিশ্বাস করি আর তিনি যেমন আমাদের আদেশ করেছেন তেমন আমরা একে অন্যকে ভালবাসি’। এই ছোটো অধ্যায়ে ভালোবাসার যে উপযুক্ত সংজ্ঞা পাই, এই জগতের সমস্ত সাহিত্যের কোথাও আমরা তা পাই না। যাই হোক, যার এরকম ভালোবাসা আছে সে-ই আসল খ্রীষ্ট বিশ্বাসী।
রাজা শলোমন ইস্রায়েল দেশে রাজত্ব করতেন খ্রীষ্ট পূর্ব ১০৭০ থেকে ১০৩০ পর্যন্ত। পবিত্র বাইবেল আমাদের বলে, ঈশ্বর রাজা শলোমনকে সমুদ্রতটের বালির মতো সীমাহীন প্রজ্ঞা আর বুদ্ধি দিয়েছিলেন। পূর্ব দেশের সকল মানুষের প্রজ্ঞার চেয়ে রাজা শলোমনের প্রজ্ঞা ছিল অনেক বেশী। সকল জাতির মানুষ শলোমনের প্রজ্ঞা শুনতে আসত। পৃথিবীর যে সব রাজা তাঁর প্রজ্ঞার বিষয়ে শুনেছিল তারা শলোমনের কাছে লোক পাঠাত। পবিত্র বাইবেলে শলোমনের হিতোপদেশের কিছু অংশ এই ছোটো অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এই হিতোপদেশগুলো ৩০০০ বছর আগে লেখা হয়েছিল। তবু আজও পৃথিবীতে এগুলো লোকের মুখে মুখে ফেরে।
পবিত্র বাইবেলের ‘গীতসংহিতা’ লেখা হয়েছিল গান করার জন্য। ঈশ্বর এর মধ্য দিয়ে এই শিক্ষা দিয়েছেন যে, আমরা যেন তাঁর উদ্দেশ্যে সব সময় গান করি। যখন আমরা দুঃখ পাই বা আনন্দে থাকি বা অসুস্থ থাকি বা বিফলতায় থাকি তখন যেন ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে গান করি। যখন আমরা পাপ করে ফেলি বা পরীক্ষায় পড়ি বা অত্যাচার ভোগ করি তখনও আমাদের উচিত তাঁর উদ্দেশ্যে গান করা। যখন তাঁর আশীর্বাদ পেয়ে আমরা আনন্দে ভরে যাই আর কৃতজ্ঞ থাকি তখন আমাদের গান করা দরকার। যখন বড়ো লোক হয়ে যাই বা গরীব হই বা অভাবে থাকি তখন দরকার ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে গান করা। ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে গান করার জন্যই খ্রীষ্ট বিশ্বাসীরা সমস্ত মানুষের মধ্যে অতুলনীয়। কীভাবে প্রার্থনা করতে হবে আর কী প্রার্থনা করতে হবে তাও গীতসংহিতা আমাদের শেখায়। যুগ যুগ ধরে খ্রীষ্ট বিশ্বাসীরা তাদের ‘স্বর্গের পিতা ঈশ্বর’-এর কাছে এইভাবেই প্রার্থনা করেছে। গীতসংহিতার গানের অনেকগুলোই প্রায় ৩০০০ বছর আগে লেখা ।